বাঙালির বর্ষা-অনুভবের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বর্ষাকবিতা ও গান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বর্ষা ঋতুকে বাদ দিয়ে রবীন্দ্র-সাহিত্যের পূর্ণতা কল্পনা করা অসম্ভব। রবীন্দ্রনাথ বর্ষা ঋতুকে দেখেছেন কেবল প্রকৃতির একটি পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং মানুষের অন্তরের গোপন বিরহ, ব্যাকুলতা ও অধ্যাত্ম-চেতনার মেলবন্ধন হিসেবে।
মেঘের ডাক আর বৃষ্টির রিমঝিম শব্দ কবির মনকে এক অজানা দূরলোকে নিয়ে যায়। ‘বর্ষামঙ্গল’ উৎসবে কবি গেয়ে ওঠেন— "হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে, ময়ূরের মতো নাচেরে।" প্রকৃতি আর মানবমন একাকার হয়ে যায়। বর্ষার নিবিড় আঁধারে মানুষের মন লৌকিক গণ্ডি ছাড়িয়ে পরমার্থের সন্ধানে পাড়ি জমায়।
"ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে\nজলাঞ্জল-ঝল-ঝল ঘন ঘোর বরষে।"
গীতাঞ্জলি পর্বের গানগুলিতে বর্ষা এসেছে ঈশ্বরের অভিসারের রূপ ধরে। শ্রাবণের ঘন অন্ধকারে যখন আকাশ ঢাকা থাকে, তখন ব্যাকুল হৃদয়ে ভক্ত অপেক্ষা করেন তাঁর পরমের জন্য— "মেঘের পরে মেঘ জমেছে, আঁধার করে আসে। আমায় কেন বসিয়ে রাখো একা দ্বারের পাশে?" বিরহী আত্মা এই বৃষ্টির রাতে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য আকুল হয়ে ওঠে।
রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পেও বর্ষা এক নীরব চরিত্রের মতো কাজ করে। ‘পোস্টমাস্টার’ গল্পে রতনের চোখের জল আর শ্রাবণের একটানা বর্ষণ মিলেমিশে এক করুণ সুর তৈরি করে। রবীন্দ্র-ভাবনায় বর্ষা তাই মিলন ও বিরহের, আশা ও আশঙ্কার এক চিরন্তন কাব্যিক ক্যানভাস।
মন্তব্যসমূহ (2)